জি-২০ভুক্ত দেশগুলোর অর্থমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়ে গেল জার্মানিতে। গত ১৭ ও ১৮ মার্চ অনুষ্ঠিত এই বৈঠক ছিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বৈঠক, তবে ট্রাম্পের কারণেই কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়। কোনো আপত্তি না জানিয়েই যুক্তরাষ্ট্রের বাধা মেনে নিয়ে মুক্ত বাণিজ্যের অঙ্গীকার থেকে সরে যায় জি-২০ভুক্ত বাকি ১৯ সদস্য।
অনেকেরই প্রশ্ন, জি সেভেন ও জি ২০ দেশগুলো কারা। কীভাবেই বা তারা বৈদেশিক মুদ্রাব্যবস্থায় সরাসরি বা সমন্বিতভাবে হস্তক্ষেপ করে। সেই তথ্যগুলো একটু জেনে নিই।
মার্চ-অক্টোবর ২০১১: ২০১১ সালের মার্চে জাপানে ভয়াবহ ভূমিকম্প ও সুনামি হয়। এতে বহু প্রাণহানির পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতির পরিমাণও কম নয়। জি সেভেন দেশগুলো এ সময় হস্তক্ষেপ করে।
সেপ্টেম্বর ২০১০: ব্যাপক অতিমূল্যায়িত ইয়েনের কারণে রপ্তানি ব্যাহত হতে থাকে জাপানের। ব্যাংক অব জাপান এককভাবে মুদ্রার শক্তিশালীকরণ ঠেকাতে পদক্ষেপ নিলে পূর্ণ সমর্থন দেয় জি-৭।
মার্চ ২০০৯: যুক্তরাজ্যে জি-২০ভুক্ত দেশগুলোর অর্থমন্ত্রীরা বৈঠকে বসেন। সম্মেলনে অর্থমন্ত্রীরা সব ধরনের সংরক্ষণবাদ প্রতিহত করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন।
সেপ্টেম্বর ২০০৮: ২০০৮ সালে বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার সৃষ্টি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের আবাসন ব্যবসার মধ্য দিয়ে মন্দার উদ্ভব হলে এর প্রভাব পড়ে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর। জি-৭ভুক্ত দেশগুলোর অর্থমন্ত্রীরা বিশ্ব অর্থনীতির মন্দাভাব দূর করতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান।
মে ২০০২-মার্চ ২০০৪: আবারও আর্থিক বাজারে অস্থিতিশীলতা তৈরি করে ইয়েন। জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপ করে এবং মার্কিন ডলারের বিপরীতে জাপানি ইয়েনের শক্তিশালীকরণ রোধে কাজ করে। ফেড ও ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাতে হস্তক্ষেপ করে।
সেপ্টেম্বর ২০০১: ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলার পর ডলারের বিপরীতে ইয়েন শক্তিশালী হয়। মুদ্রাবাজারে ভারসাম্য আনতে জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ একসঙ্গে ইয়েন কেনা শুরু করে।
সেপ্টেম্বর-নভেম্বর ২০০০: ১৯৯৯ সালে ইউরোপের একক মুদ্রা ইউরো চালু হওয়ার পর এক বছরে প্রায় ৩০ শতাংশ দর পড়ে মুদ্রাটির। ইউরোর দর বাড়ানোর চেষ্টায় একসঙ্গে কাজ শুরু করে ইউরোপের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র।
সেপ্টেম্বর ১৯৯৯: জি-২০ নামের এর ব্যানারে সর্বপ্রথম জি-২০ভুক্ত দেশগুলোর অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধানেরা বৈঠকে বসেন।
জানুয়ারি ১৯৯৯-এপ্রিল ২০০০: শক্তিশালী ইয়েনের কারণে অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা প্রকট হবে বলে বিশ্ব অর্থনীতিতে উদ্বেগ তৈরি হয়। এ সময় বাজারে ভারসাম্য আনতে ১৮ বার ইয়েন বিক্রি করে জাপান।
এপ্রিল-জুন ১৯৯৮: ডলারের বিপরীতে ইয়েন দুর্বল হয়ে পড়ায় ১৯৯৮ সালের এই সময়টায় বিশ্ব মুদ্রাবাজারে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়। জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রও এগিয়ে আসে।
এপ্রিল ১৯৯৪-আগস্ট ১৯৯৫: তৎকালীন জার্মান মুদ্রা মার্ক ও জাপানের মুদ্রা ইয়েনের বিপরীতে ডলারের ব্যাপক অবমূল্যায়ন হয়। ১৯৯৪-এর এপ্রিল থেকে, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ, জাপান এবং ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে মিলিত হয়ে মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপ করে।
১৯৯১-১৯৯২: উপসাগরীয় যুদ্ধের পর মার্কিন অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দিলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বারবার হস্তক্ষেপ করে।
১৯৮৮-১৯৯০: এই দুই বছর ডলারের দর ব্যাপক বাড়তে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিনিময় হারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার গুরুত্ব আরোপ করে জি ৭ দেশগুলো।
ফেব্রুয়ারি ১৯৮৭: ডলারের অবমূল্যায়ন ঠেকাতে জি-৭ দেশগুলো প্যারিসে বৈঠকে বসে। যা ‘ল্যুভর অ্যাকর্ড’ নামে পরিচিত।
সেপ্টেম্বর ১৯৮৫: ১৯৮৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ‘প্লাজা অ্যাকর্ড’ নামের বৈঠকে জাপানকে চাপ দিয়ে ইয়েনের দাম বাড়াতে সক্ষম হয়। কিন্তু ৫০ শতাংশ বৃদ্ধির পরও জাপানের তুলনায় মার্কিন উৎপাদকদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়েনি।
১৯৭৬: ১৯৭৬ সালে কানাডার যোগদানের মধ্য দিয়ে জি-৬, জি-৭-এ পরিণত হয়।
১৯৭৫: ফ্রান্সের উদ্যোগে ১৯৭৫ সালে বিশ্বের ৬টি দেশ—ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, জাপান, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র মিলে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বলয় জি ৬ গঠন করে।
১৯৭৩: ১৯৭৩ সালে জ্বালানি তেল নিয়ে সংকট দেখা দিলে শিল্পোন্নত দেশগুলোর একটি অর্থনৈতিক বলয় গঠনের ধারণা আসে। ১৯৭৪ সালে ওয়াশিংটন ডিসির হোয়াইট হাউসের লাইব্রেরিতে বেশ কয়েকটি সভা হয়, যা ‘লাইব্রেরি গ্রুপ’ নামে পরিচিতি লাভ করে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, সাবেক পশ্চিম জার্মানি ও ফ্রান্সের উচ্চপদস্থ অর্থনৈতিক কর্মকর্তাদের অনানুষ্ঠানিক বৈঠক ছিল এটি। এর মাধ্যমেই যাত্রা শুরু করে জি-৫।
এভাবে বিভিন্ন সময় বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করেছে জি-৭ ও জি ২০। জি-৭-এ ১৯৯৮ সালে রাশিয়া যুক্ত হয়ে জি-৮ হিসেবে পরিচিতি পায়। তবে ইউক্রেন যুদ্ধের জের ধরে পশ্চিমা দেশগুলো কর্তৃক ব্যবসা-বাণিজ্যে রাশিয়ার প্রতি নিষেধাজ্ঞা জারির প্রতিবাদে ২০১৪ সালের ২৫ মার্চ জি-৮ ত্যাগ করে দেশটি।
আবার বিশ্বের ২০টি দেশের অর্থমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের সমন্বয়ে গঠিত জোট হলো জি-২০। গ্রুপের সদস্য ১৯টি দেশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ১৯টি দেশ হলো অস্ট্রেলিয়া, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি, কানাডা, চীন, কোরিয়া, মেক্সিকো, রাশিয়া, সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, ফ্রান্স, দক্ষিণ আফ্রিকা, জাপান।
No comments:
Post a Comment