সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে আমাদের পথ চলা

Breaking News

Thursday, April 27, 2017

সিলেটে বিএনপির ‌‘সব কুল রক্ষা

কাউন্সিলরদের ভোটে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত করার প্রায় ১৪ মাস পর সিলেটে বিএনপির নগর ও জেলার পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে কেন্দ্র থেকে। গতকাল বুধবার রাতে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কমিটি ঘোষণা করেন। পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে স্থান পেয়েছেন বিভিন্ন ধারায় বিভক্ত নেতারা। সিলেটে বিএনপির রাজনীতির ইতিহাসে এত বড় কমিটি এর আগে হয়নি। কমিটিতে স্থান পাওয়া নেতারাই বলছেন, ঢাউস কমিটি। তাঁদের ভাষ্য, দুটি কমিটিতে ‘সব কুল’ রক্ষা হয়েছে। 

সিলেটের রাজনীতিতে প্রয়াত সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান ও বিএনপির নিখোঁজ নেতা এম ইলিয়াস আলী বলয়ে বিভক্ত বিএনপি। সাইফুর রহমান ২০০৯ সালের ৫ সেপ্টেম্বর সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। ইলিয়াস ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল থেকে নিখোঁজ। দুই নেতা দৃশ্যত আড়াল হলেও প্রজন্মের হাত ধরে তাঁদের নিয়ে বিভক্তি এখনো দৃশ্যমান। বিভিন্ন কর্মসূচি থেকে শুরু করে কমিটি গঠন, পুনর্গঠন—সবকিছুতেই সেই বিভক্তি ঘিরে মত-দ্বিমত প্রকাশ পায়। 
২০১৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি কাউন্সিলরদের সরাসরি ভোটে আবুল কাহের শামীমকে সভাপতি, আলী আহমদকে সাধারণ সম্পাদক এবং এমরান আহমেদকে সাংগঠনিক সম্পাদক করে জেলা বিএনপির কমিটি গঠন করা হয়েছিল। 
জেলার সভাপতি ও সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুর অনুসারী। সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস অনুসারী। এর আগে ২০১০ সালে ইলিয়াস আলীর নেতৃত্বাধীন কমিটি ছিল। এতে ইলিয়াস আলী সভাপতি ছিলেন। ইলিয়াস আলী ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল নিখোঁজ হন। এরপর থেকে স্থবির ছিল কমিটি। ২০১৪ সালে ওই কমিটি ভেঙে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছিল। 
একই দিন মহানগর বিএনপির সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে নাসিম হোসাইনকে সভাপতি, বদরুজ্জামান সেলিমকে সাধারণ সম্পাদক ও মিফতাহ সিদ্দিকীকে সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত করেন কাউন্সিলররা। এ তিনজনই সাইফুর অনুসারী। সর্বশেষ ২০০৪ সালে মহানগর বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠিত হয়েছিল। তখন ৭১ সদস্যের কমিটি ছিল। উভয় কমিটিতে এবার প্রথম রাখা হয়েছে সহসভাপতি পদমর্যাদার উপদেষ্টা ও সম্মানিত সদস্য। এ দুটি কমিটি ২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবে বলে কেন্দ্র থেকে জানানো হয়েছে।
মহানগরে শতাধিক ‘অচেনা মুখ’: ঘোষিত মহানগর কমিটিতে অন্তত শতাধিক ‘অচেনা মুখ’ নেতৃত্বে এসেছেন বলে কমিটির একাধিক নেতা জানিয়েছেন। এই নেতারা জানান, কমিটিতে ২৮১ জন অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ৫০ জনকে সহসভাপতির পদমর্যাদায় উপদেষ্টা হিসেবে রাখা হয়েছে। বাকি ২৩১ জন রয়েছেন নির্বাহী কমিটিতে। এ কমিটিতে স্থান পাওয়া অন্তত শতাধিক ব্যক্তি একেবারেই নতুন বলে কমিটিরই গুরুত্বপূর্ণ দুজন নেতা দাবি করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নেতৃস্থানীয় এক নেতা বলেন, ‘আমি ছাত্রদল, যুবদল হয়ে এখন বিএনপির রাজনীতি করছি। অথচ খোদ আমিই কমিটির তালিকায় অন্তত শতাধিক অচেনা ব্যক্তির নাম দেখতে পাচ্ছি। এটি সাংগঠনিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করবে। এ ছাড়া অনেক তরুণ নেতা-কর্মী রয়েছেন, যাঁদের সহসভাপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে। জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে এ ধরনের চর্চায় রাজনৈতিক পরম্পরা সম্পূর্ণভাবে বিনষ্ট হবে।’
সদ্যঘোষিত মহানগর কমিটিতে স্থান পাওয়া এক তরুণ নেতা বলেন, ‘আমাকে যে পদে বসানো হয়েছে, সেটি আমার কল্পনারও বাইরে ছিল। আমি এ পদপ্রত্যাশী কখনোই ছিলাম না। তবে আমাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রাখায় অবশ্যই খুশি হয়েছি এবং আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করব।’ কমিটিতে স্থান পাওয়া আরও দুজন নেতা জানান, নানা ধারা-উপধারার নেতা-কর্মীদের কমিটিতে রাখার কারণে দলে কোনো অসন্তোষ নেই। তবে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন হওয়ায় প্রকাশ্যে কিছু না বললেও অনেক নেতা-কর্মী ভেতরে-ভেতরে ক্ষুব্ধ রয়েছেন।
মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠিত না হওয়ায় অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা সত্ত্বেও কমিটিতে ছিলেন না। এ অবস্থায় কমিটি ঘোষিত হওয়ায় সব পক্ষের নেতা-কর্মীদের কমিটিতে রাখার চেষ্টা করেছে কেন্দ্র। তাই কমিটি আকারে ঢাউস হয়েছে। আগামী আন্দোলন-সংগ্রাম সফল করতে নবীন-প্রবীণের সমন্বয়ে এই কমিটি গঠিত হওয়ার দলে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।’
বিভেদ ঠেকাতে পরিসর বড়: সাইফুর-ইলিয়াস বলয়ের পাশাপাশি জেলা বিএনপিতে মধ্যম সারির নেতাকেন্দ্রিক নানা উপবলয়ও রয়েছে। সব বলয়ের নেতা-কর্মীদের বিভেদ ঠেকাতে কমিটির আকার বাড়ানো হয়েছে বলে দলটির একাধিক নেতা নিশ্চিত করেছেন। কমিটিতে স্থান পাওয়া দুজনের ভাষ্য, জাতীয় নির্বাচনের আগমুহূর্তে কমিটি গঠন নিয়ে দলে যেন কোনো অসন্তোষ এবং বিশৃঙ্খলা তৈরি না হয়, সে জন্য কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে ২৩১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটির পাশাপাশি সহসভাপতির মর্যাদায় আরও ৫০ জন উপদেষ্টা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নির্বাচনের আগে যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে সাংগঠনিকভাবে যেন নেতা-কর্মীরা ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারেন, তাই ইচ্ছাকৃতভাবেই কেন্দ্র থেকে কমিটির পরিসর বড় করে দেওয়া হয়েছে।
সিলেট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলী আহমদ জানান, অনেক দিন ধরে পূর্ণাঙ্গ কমিটি না হওয়ায় নেতা-কর্মীদের ভেতরে একধরনের চাপা ক্ষোভ ছিল। এমনকি দলে নানা বিভেদও ছিল। এসব ক্ষোভ-বিভেদ নিরসনের জন্যই সব ধারা-উপধারার নেতা-কর্মীদের নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাই পরিসর বেড়েছে। জেলা বিএনপির সভাপতি আবুল কাহের শামীম প্রথম আলোকে বলেন, ‘কমিটি ঢাউস হওয়ায় কাজে গতি আসবে। শিগগিরই নতুন কমিটি নিয়ে বৈঠক করে দলীয় কর্মকাণ্ড আরও চাঙা করা হবে।

No comments:

Post a Comment